Saturday, February 13, 2010

জলবায়ু পরিবর্তনঃ যে সত্য উপেক্ষিত

বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন উপলক্ষে কোপেনহেগেনে প্রতিদিনই দেখা গেছে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী কার্বন গ্যাস নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিজ্ঞানী, উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধি ও প্রতিবাদী পরিবেশ আন্দোলনকারীদের ভূমিকা ও প্রস্তাব। কিন্তু উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের সরকারগুলোর কাছে তাদের কোনো আবেদনই পাত্তা পায়নি। ফলে কোপেনহেগেনে এমন কিছু বিষয় বা ধারণা উপেক্ষিত হয়েছে, জলবায়ুর বিপর্যয় থেকে বিশ্বকে সত্যিকার অর্থে রক্ষা করতে সেগুলোর গুরুত্ব অনস্বীকার্য।উপেক্ষিত ধারণা এক : আন্তর্জাতিক পরিবেশ বিষয়ক আদালত। গ্যাস নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে বিশ্বনেতারা দাবি উত্থাপন করেছিলেন, কোপেনহেগেনে তা ফলপ্রসূ হয়নি। আসলে কোনো কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অন্যরা মেনে চলতে বাধ্য না হলে কোনো কিছুই আশা করা যায় না। কিয়োটোতে গ্যাস নিঃসরণ হ্র্রাসের অঙ্গীকারপত্রে সই করেছিল কানাডা। হ্রাস তো দূরের কথা, উল্টো তখন থেকে তারা গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা ২৬ শতাংশ বাড়িয়েছে। কোপেনহেগেনে তার প্রতিকারের ব্যবস্থা ছিল না। যে দেশে হিমবাহ দ্রুতগতিতে গলে যাচ্ছে সেই বলিভিয়া থেকে আগত প্রতিনিধিরা বেশ সাহসের সঙ্গে বলেছেন_ বর্তমান যেসব ধনী দেশ কার্বন গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসের ব্যাপারে সিরিয়াস, আগে তাদের গ্যাস হ্রাসের পরিমাণ তদারকির জন্য পরিবেশ বিষয়ক আদালতের প্রয়োজন আছে। সেই আদালতের শাস্তি প্রদান এবং তা কার্যকর করার ক্ষমতা থাকতে হবে।
উপেক্ষিত ধারণা দুই : ভূগর্ভস্থ জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, ধনী দেশের সরকারগুলো একদিকে জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলন বন্ধ করার কথা বলে সেই জ্বালানির সন্ধানেই মাটি খুঁড়তে ইতস্তত করে না। এজন্য তাদের অনুসন্ধানের বিরাম নেই। তাদের একহাতে অগি্ননির্বাপক যন্ত্র, আরেক হাতে অগি্নসংযোগের মশাল। এই দ্বিমুখী আচরণ পরিত্যাগ করতে হবে। চলতি বছরের প্রথম দিকে 'ন্যাচার' সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত মাত্র ৬০ শতাংশ জ্বালানি তেল, কয়লা ও গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতেই বিশ্বকে উষ্ণায়নের মতো বিপদের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কাজেই জীবাশ্ম জ্বালানি অনুসন্ধান মুলতবি রেখেই জলবায়ু বিপর্যয় রোধের চুক্তি নিয়ে ভাবতে হবে। অব্যবহৃত জ্বালানির ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ও সুদূরপ্রসারী জলবায়ু অনুকূল পরিকল্পনা থাকতে হবে। কিন্তু কোপেনহেগেনে এ ব্যাপারে বিশ্বনেতাদের মুখ খুলতে দেখা যায়নি।
উপেক্ষিত ধারণা তিন : জলবায়ু বিতর্ক। বৈশি্বক উষ্ণায়নের জন্য ৭০ শতাংশ দায়ী ধনী দেশগুলো। অন্যদিকে ৭০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। কোপেনহেগেনে জলবায়ু বিপর্যয় নিয়ে বিতর্ক যথাযথভাবে উত্থাপিত হয়নি। যে কারণে সন্তোষজনক পথের নিশানা মেলেনি। দরিদ্র দেশগুলোর পক্ষ থেকে যখনই ক্ষতিপূরণের দাবি উঠেছে তখনই প্রধান মধ্যস্থতাকারী বলে উঠেছে_ কফিনের পেছনে তো অর্থ দেওয়া যায় না। যখন বৈশি্বক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্যাস নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন ওঠে তখনই ধনী দেশগুলোর পক্ষ থেকে সবক দেওয়া হয়_ কার্বন গ্যাস উপাদনের দায়ভার সবাইকে নিতে হবে। এভাবেই জলবায়ু পরিবর্তনের যৌক্তিক বিতর্কের অপমৃত্যু ঘটে ধনী দেশগুলোর হাতে। ন্যায়বিচারের মূল নীতিই যদি উপেক্ষিত হয়, তাহলে কীভাবে সব দেশের সম্মতিতে একটি স্থায়ী চুক্তি আশা করা যায়?
সত্যিকারের ধারণার ওপর ভিত্তি করেই জলবায়ু বিপর্যয় রোধের চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়া উচিত। কিন্তু কোপেনহেগেনে অনেক বাস্তব ধারণাই উপেক্ষিত হয়েছে। সেখানে বিকল্প খোঁজা হয়েছে ধনী দেশগুলোর স্বার্থে। যারা কার্বন উৎপাদনকারী, কার্বন ব্যবসায়ী ও কার্বন দখলদার। আর যাই হোক, তারা বিশ্বকে আপদের হাত থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। তাদের পক্ষে পরিত্রাণের পথ খোঁজাটাই অবাস্তব। যতদিন তাদের মধ্যে এ উপলব্ধি আসবে না ততদিন ইতিবাচক ফল আসবে না। মোটকথা, কোপেনহেগেনে এমন সব সত্যকে উপেক্ষা করা হয়েছে, মনুষ্যসৃষ্ট বৈশি্বক উষ্ণায়ন থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে হলে সেগুলোর প্রয়োজন পড়বে।
ইন্ডিপেনডেন্ট (ইউকে) থেকে ভাষান্তর : সারোয়ার কবীর

No comments:

Post a Comment